এই লেখায় যা আছে
সন্তান না হলে আমাদের সমাজে অনেক সময় শুধু নারীকেই দায়ী করা হয়। অথচ গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে পুরুষের কোনো না কোনো কারণ এতে ভূমিকা রাখে। তাই লজ্জা বা দ্বিধা না করে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই পরীক্ষা করানো উচিত। পুরুষের বন্ধ্যাত্বের অনেক কারণই চিকিৎসাযোগ্য।
কখন পরীক্ষা করাবেন
- নিয়মিত (সপ্তাহে দুই-তিনবার) জন্মনিরোধক ছাড়া সহবাসের পরও এক বছরে গর্ভধারণ না হলে।
- স্ত্রীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ছয় মাস পরেই।
- আগে অণ্ডকোষে অপারেশন, মাম্পস রোগ, অণ্ডকোষ থলিতে না নামা, বা যৌন সমস্যা থাকলে আরও আগে।
পুরুষের বন্ধ্যাত্বের সাধারণ কারণ
- শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া (অলিগোস্পার্মিয়া) বা একেবারে না থাকা (অ্যাজোস্পার্মিয়া)।
- শুক্রাণুর গতি কম বা গঠনে সমস্যা।
- ভ্যারিকোসিল: অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া। এটি পুরুষের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম সাধারণ এবং চিকিৎসাযোগ্য কারণ।
- হরমোনের সমস্যা।
- প্রজননতন্ত্রে সংক্রমণ।
- শুক্রাণু বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকা।
- জিনগত কারণ।
- যৌন সমস্যা, যেমন লিঙ্গ শক্ত না হওয়া (ইরেক্টাইল ডিসফাংশন) বা দ্রুত বীর্যপাত।
- জীবনযাপন: ধূমপান, মদ্যপান, স্থূলতা, অতিরিক্ত তাপ এবং বডি বিল্ডিংয়ের জন্য স্টেরয়েড বা টেস্টোস্টেরন সেবন।
কী কী পরীক্ষা করা হয়
- বীর্য পরীক্ষা (সিমেন অ্যানালাইসিস): সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষা। সাধারণত দুই থেকে সাত দিন সহবাস বা বীর্যপাত থেকে বিরত থেকে নমুনা দিতে হয়। রিপোর্ট অস্বাভাবিক হলে কয়েক সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা করা হয়।
- হরমোন পরীক্ষা: FSH, LH, টেস্টোস্টেরন, প্রোল্যাকটিন ইত্যাদি।
- অণ্ডকোষের আলট্রাসনোগ্রাম ও ডপলার: ভ্যারিকোসিল বা অন্য সমস্যা দেখতে।
- প্রয়োজনে জেনেটিক পরীক্ষা: বিশেষ করে শুক্রাণু একেবারে না থাকলে।
চিকিৎসা
- জীবনযাপনে পরিবর্তন: ধূমপান ত্যাগ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম।
- সংক্রমণ বা হরমোনের সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসা।
- ভ্যারিকোসিল থাকলে প্রয়োজনে অপারেশন, যাতে অনেকের শুক্রাণুর মান উন্নত হয়।
- শুক্রাণু বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকলে তা খোলার অপারেশন।
- বীর্যে শুক্রাণু না থাকলে অণ্ডকোষ থেকে সরাসরি শুক্রাণু সংগ্রহ (TESA বা মাইক্রো-TESE), যা দিয়ে আইসিএসআই (ICSI) পদ্ধতিতে সন্তান ধারণ সম্ভব হতে পারে।
- যৌন সমস্যার চিকিৎসা।
- প্রয়োজনে গাইনি বিশেষজ্ঞের সাথে মিলে IUI, IVF বা ICSI।
শুক্রাণুর মান ভালো রাখতে যা করবেন
- ধূমপান ও তামাক পুরোপুরি ছাড়ুন।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- ফল, শাকসবজি ও সুষম খাবার খান।
- অণ্ডকোষে অতিরিক্ত গরম এড়ান, যেমন কোলে ল্যাপটপ রেখে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন বা তথাকথিত “শক্তিবর্ধক” ওষুধ খাবেন না। বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন নিলে শরীরে শুক্রাণু তৈরি কমে যেতে পারে।
নতুন শুক্রাণু তৈরি হতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। তাই চিকিৎসা বা অভ্যাস পরিবর্তনের ফল বুঝতে সাধারণত তিন মাস পর আবার বীর্য পরীক্ষা করা হয়।
আরও পড়ুন: পুরুষদের যৌন সমস্যা ও বন্ধ্যাত্বে সঠিক পরামর্শ
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
বীর্যে শুক্রাণু একেবারে না থাকলে কি সন্তান সম্ভব?
অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব। কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা করা হয়, আর প্রয়োজনে অণ্ডকোষ থেকে সরাসরি শুক্রাণু সংগ্রহ করে ICSI পদ্ধতিতে সন্তান ধারণ করা যায়।
ভ্যারিকোসিল হলে কি সবসময় অপারেশন লাগে?
না। শুক্রাণুর মান কম এবং সন্তান না হওয়ার সমস্যা থাকলে, অথবা অণ্ডকোষে ব্যথা থাকলে অপারেশন বিবেচনা করা হয়। শুধু ভ্যারিকোসিল থাকলেই অপারেশন দরকার নেই।
পুরুষের বন্ধ্যাত্বের জন্য কোন ডাক্তার দেখাব?
ইউরোলজিস্ট বা এন্ড্রোলজিস্ট। তারা পুরুষের প্রজনন অঙ্গ, হরমোন ও যৌন স্বাস্থ্যের চিকিৎসা করেন। প্রয়োজনে স্ত্রীর গাইনি বিশেষজ্ঞের সাথে সমন্বয় করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
স্বপ্নদোষ বা হস্তমৈথুনে কি বন্ধ্যাত্ব হয়?
না। এগুলো স্বাভাবিক শারীরিক বিষয় এবং বন্ধ্যাত্বের কারণ নয়। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়; কোনো ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করবেন না।


