ইউরোলজি স্বাস্থ্য

কিডনিতে পাথর: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

Dr. Md. Mezbahul Moker Rabin ইউরোলজিস্ট ও কিডনি সার্জন ৪ মিনিটে পড়ুন
Endoscopic urological surgery by Dr. Mezbahul Moker Rabin
এই লেখায় যা আছে
  1. কিডনির পাথর কত ধরনের?
  2. কিডনিতে পাথরের লক্ষণ
  3. কখন দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন
  4. কেন পাথর হয়: কারণ ও ঝুঁকি
  5. পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়
  6. কিডনির পাথরের চিকিৎসা
  7. আবার পাথর হওয়া ঠেকানোর উপায়
  8. সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) ইউরোলজির সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি। গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম আর কম পানি পানের কারণে আমাদের দেশে এই সমস্যা অনেক বেশি দেখা যায়। প্রস্রাবে থাকা খনিজ লবণ জমে শক্ত দানা তৈরি হলে তাকেই পাথর বলে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ পাথরই পেট না কেটে সারানো সম্ভব।

কিডনির পাথর কত ধরনের?

  • ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর: সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
  • ইউরিক অ্যাসিড পাথর: গেঁটেবাত (গাউট), ডায়াবেটিস বা বেশি মাংস খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত।
  • স্ট্রুভাইট পাথর: বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ থেকে হয় এবং দ্রুত বড় হতে পারে।
  • সিস্টিন পাথর: বংশগত কারণে হয়, তবে খুবই বিরল।

কিডনিতে পাথরের লক্ষণ

  • কোমর বা পিঠের এক পাশে তীব্র ব্যথা, যা তলপেট ও কুঁচকি পর্যন্ত ছড়াতে পারে। ব্যথা সাধারণত ঢেউয়ের মতো আসে-যায়।
  • বমি বমি ভাব বা বমি।
  • প্রস্রাবে রক্ত, বা প্রস্রাবের রং লালচে বা বাদামি হয়ে যাওয়া।
  • প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ।
  • সংক্রমণ থাকলে জ্বর ও কাঁপুনি।

মনে রাখবেন, কিডনির ভেতরে থাকা ছোট পাথরে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না, অন্য কারণে আলট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়ে ধরা পড়ে।

কখন দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন

  • ব্যথার সাথে জ্বর ও কাঁপুনি থাকলে। পাথরের কারণে প্রস্রাবের পথ বন্ধ থাকা অবস্থায় সংক্রমণ বিপজ্জনক হতে পারে।
  • ব্যথানাশক ওষুধেও ব্যথা না কমলে।
  • বারবার বমির কারণে পানি বা ওষুধ খেতে না পারলে।
  • প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে।
  • যাদের একটি মাত্র কিডনি, অথবা গর্ভাবস্থায়।

কেন পাথর হয়: কারণ ও ঝুঁকি

  • পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, অতিরিক্ত গরমে কাজ বা অতিরিক্ত ঘাম।
  • খাবারে বেশি লবণ।
  • অতিরিক্ত প্রাণিজ প্রোটিন, যেমন গরু-খাসির মাংস।
  • স্থূলতা ও ডায়াবেটিস।
  • পরিবারে কারও পাথরের ইতিহাস।
  • বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ।
  • গেঁটেবাত, প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা ও কিছু ওষুধ।

পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়

প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, রক্তে ক্রিয়েটিনিন (কিডনির কার্যক্ষমতা), পেটের আলট্রাসনোগ্রাম এবং প্রয়োজনে এক্স-রে KUB করা হয়। পাথরের সঠিক আকার ও অবস্থান জানার জন্য কন্ট্রাস্ট ছাড়া সিটি স্ক্যান (CT KUB) সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা।

কিডনির পাথরের চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে পাথরের আকার, অবস্থান, লক্ষণ এবং কিডনির অবস্থার ওপর।

  • ওষুধ ও পর্যবেক্ষণ: ছোট পাথর (সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম) অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি এবং চিকিৎসকের দেওয়া ব্যথানাশক ও পাথর বের হতে সহায়ক ওষুধে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়।
  • ESWL (শক ওয়েভ): শরীরের বাইরে থেকে শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভেঙে দেওয়া হয়, কোনো কাটা-ছেঁড়া লাগে না। নির্দিষ্ট আকার ও অবস্থানের পাথরে কার্যকর।
  • URS ও লেজার: প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে সরু ক্যামেরা (ইউরেটেরোস্কোপ) ঢুকিয়ে লেজার দিয়ে মূত্রনালির পাথর ভাঙা হয়। পেট কাটতে হয় না।
  • RIRS: নমনীয় (ফ্লেক্সিবল) ইউরেটেরোস্কোপ দিয়ে কিডনির ভেতরের পাথর লেজারে ভাঙা হয়।
  • PCNL: বড় পাথরের (সাধারণত ২ সেন্টিমিটারের বেশি) জন্য পিঠে ছোট একটি ছিদ্র করে পাথর বের করা হয়।
  • ল্যাপারোস্কোপিক বা ওপেন সার্জারি: এখন শুধু বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে লাগে।

কোন পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত, তা পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ইউরোলজিস্ট ঠিক করবেন। আমাদের চিকিৎসা সেবা পাতায় বিস্তারিত দেখুন।

আবার পাথর হওয়া ঠেকানোর উপায়

  • দিনে এমন পরিমাণ পানি পান করুন যাতে প্রস্রাব হালকা হলুদ বা প্রায় স্বচ্ছ থাকে। বেশিরভাগ মানুষের জন্য এটা দিনে আড়াই থেকে তিন লিটার, গরমে বা বেশি ঘামলে আরও বেশি। কিডনি বা হার্টের রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো পানি খাবেন।
  • খাবারে লবণ কম খান, পাতে আলাদা লবণ নেবেন না।
  • মাংস পরিমিত খান।
  • দুধ-দই জাতীয় খাবারের স্বাভাবিক ক্যালসিয়াম বাদ দেবেন না। খাবারের ক্যালসিয়াম বরং পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাবেন না।
  • কোমল পানীয় (কোলা) কম পান করুন। লেবুর শরবত উপকারী হতে পারে।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • পাথর বের হলে বা অপারেশনে বের করা হলে সেটা পরীক্ষা (স্টোন অ্যানালাইসিস) করান। পাথরের ধরন জানলে প্রতিরোধ সহজ হয়।

আরও পড়ুন: কিডনি ভালো রাখার ৭টি সহজ অভ্যাস

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

কিডনির পাথর কি ওষুধে গলে যায়?

ইউরিক অ্যাসিড পাথর কিছু ক্ষেত্রে ওষুধে গলানো যায়। কিন্তু বেশিরভাগ পাথর ক্যালসিয়ামের তৈরি, যা ওষুধে গলে না। ছোট হলে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যেতে পারে, বড় হলে লেজার বা অন্য পদ্ধতি লাগে।

একবার পাথর হলে কি আবার হতে পারে?

হ্যাঁ। প্রতিরোধের নিয়ম না মানলে প্রায় অর্ধেক রোগীর পরের দশ বছরের মধ্যে আবার পাথর হয়। পর্যাপ্ত পানি পান আর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এই ঝুঁকি অনেক কমায়।

পেট না কেটে কি পাথরের অপারেশন সম্ভব?

হ্যাঁ। এখন বেশিরভাগ পাথর URS, RIRS, PCNL বা ESWL পদ্ধতিতে পেট না কেটেই চিকিৎসা করা যায়। এতে ব্যথা কম হয় এবং রোগী দ্রুত স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারেন।

পাথর থেকে কি কিডনি নষ্ট হতে পারে?

দীর্ঘদিন প্রস্রাবের পথ বন্ধ থাকলে বা বারবার সংক্রমণ হলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। তাই ব্যথা না থাকলেও পাথরের চিকিৎসা ও নিয়মিত ফলো-আপ জরুরি।

এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়; কোনো ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করবেন না।

শেয়ার করুন WhatsApp Facebook

অ্যাপয়েন্টমেন্ট

রংপুরে অভিজ্ঞ ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন

  • রংপুরসান কনসালটেশন সেন্টার (ইউনিট ২): শনি, রবি, সোম ও বুধ, বিকাল ৩টা – রাত ৮টা
  • রংপুরপপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার (ইউনিট-১): শুক্রবার, সকাল ১০টা – সন্ধ্যা ৬টা
  • নীলফামারীইবাদত হাসপাতাল: মঙ্গলবার, বিকাল ৩টা – রাত ৮টা
  • সৈয়দপুরপপুলার ল্যাব: বৃহস্পতিবার, বিকাল ৩টা – সন্ধ্যা ৬টা