এই লেখায় যা আছে
পঞ্চাশ বছরের পর অনেক পুরুষের প্রস্রাবের ধারা চিকন হয়ে যায়, রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য উঠতে হয়। এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া, যাকে চিকিৎসার ভাষায় বিনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া (BPH) বলে। “বিনাইন” মানে এটি ক্যান্সার নয়। সঠিক চিকিৎসায় এই সমস্যা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্রোস্টেট কী এবং কেন বড় হয়?
প্রোস্টেট পুরুষের মূত্রথলির ঠিক নিচে, প্রস্রাবের নালিকে ঘিরে থাকা একটি ছোট গ্রন্থি। বয়স বাড়ার সাথে হরমোনের প্রভাবে এটি ধীরে ধীরে বড় হয় এবং প্রস্রাবের পথ সরু করে দেয়। ফলে মূত্রথলিকে বেশি চাপ দিয়ে প্রস্রাব বের করতে হয়।
প্রোস্টেট বড় হওয়ার লক্ষণ
- প্রস্রাবের ধারা চিকন বা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
- প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া বা চাপ দিতে হওয়া।
- থেমে থেমে প্রস্রাব হওয়া।
- প্রস্রাবের পরও মনে হওয়া পুরোপুরি হয়নি।
- ঘন ঘন প্রস্রাব, বিশেষ করে রাতে বারবার ঘুম থেকে উঠতে হওয়া।
- হঠাৎ জোরালো বেগ এবং চেপে রাখতে কষ্ট হওয়া।
- প্রস্রাবের শেষে ফোঁটা ফোঁটা পড়া।
কখন জরুরি চিকিৎসা দরকার
- প্রস্রাব একেবারে আটকে গেলে এবং তলপেট ফুলে ব্যথা করলে। এটি জরুরি অবস্থা, দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
- প্রস্রাবে রক্ত গেলে।
- জ্বরসহ প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে।
- মূত্রথলিতে পাথর ধরা পড়লে।
- রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেড়ে গেলে, অর্থাৎ কিডনির ওপর চাপ পড়লে।
কী কী পরীক্ষা করা হয়
- শারীরিক পরীক্ষা, যার মধ্যে প্রোস্টেট পরীক্ষা (DRE) থাকতে পারে।
- প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, সংক্রমণ বা রক্ত আছে কিনা দেখতে।
- আলট্রাসনোগ্রাম: প্রোস্টেটের আকার এবং প্রস্রাবের পর মূত্রথলিতে কতটা প্রস্রাব থেকে যায় (PVR) তা দেখতে।
- PSA রক্ত পরীক্ষা: প্রোস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাবনা যাচাইয়ে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী।
- ইউরোফ্লোমেট্রি: প্রস্রাবের গতি মাপা।
- রক্তে ক্রিয়েটিনিন: কিডনির অবস্থা দেখতে।
চিকিৎসা
১. জীবনযাপনে পরিবর্তন ও পর্যবেক্ষণ: লক্ষণ হালকা হলে অনেক সময় শুধু কিছু অভ্যাস বদলালেই উপকার পাওয়া যায়।
- সন্ধ্যার পর পানি, চা ও কফি কম খাওয়া।
- ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা।
- কোষ্ঠকাঠিন্য দূর রাখা।
- প্রস্রাব দীর্ঘক্ষণ চেপে না রাখা।
২. ওষুধ: কিছু ওষুধ প্রস্রাবের পথ শিথিল করে ধারা উন্নত করে, আবার কিছু ওষুধ কয়েক মাস ধরে খেলে প্রোস্টেটের আকার কমায়। এসব ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, তাই অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে খাবেন।
৩. অপারেশন: ওষুধে কাজ না হলে বা জটিলতা দেখা দিলে অপারেশন প্রয়োজন হয়। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি TURP, যেখানে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে এন্ডোস্কোপ ঢুকিয়ে প্রোস্টেটের বাড়তি অংশ কেটে ফেলা হয়, পেট কাটতে হয় না। কিছু ক্ষেত্রে লেজার পদ্ধতি এবং খুব বড় প্রোস্টেটে ওপেন বা ল্যাপারোস্কোপিক অপারেশন করা হয়।
প্রোস্টেট বড় হওয়া আর প্রোস্টেট ক্যান্সার কি একই?
না। BPH ক্যান্সার নয় এবং এটি থেকে ক্যান্সার হয় না। তবে একই মানুষের দুটোই একসাথে থাকতে পারে এবং শুরুর দিকের লক্ষণও প্রায় একই রকম। তাই পঞ্চাশ বছরের পর, অথবা পরিবারে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে আরও আগে, প্রস্রাবের সমস্যা হলে ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রোস্টেট বড় হলে কি অপারেশন লাগবেই?
না। অনেকের সমস্যা ওষুধ ও জীবনযাপনে পরিবর্তনেই নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রস্রাব বারবার আটকে গেলে, বারবার সংক্রমণ বা মূত্রথলিতে পাথর হলে, কিডনির ক্ষতি হলে অথবা ওষুধে কাজ না হলে অপারেশনের প্রয়োজন হয়।
TURP অপারেশনে কি পেট কাটতে হয়?
না। TURP প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে এন্ডোস্কোপের সাহায্যে করা হয়, শরীরের বাইরে কোনো কাটা দাগ থাকে না। সাধারণত কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হয়।
রাতে বারবার প্রস্রাব মানেই কি প্রোস্টেটের সমস্যা?
সবসময় নয়। ডায়াবেটিস, রাতে বেশি পানি পান, হার্টের সমস্যা, ঘুমের সমস্যা বা মূত্রথলির অন্য রোগেও এমন হতে পারে। তাই কারণ জানতে পরীক্ষা প্রয়োজন।
PSA বেশি মানেই কি ক্যান্সার?
না। প্রোস্টেট বড় হলে, প্রোস্টেটে সংক্রমণ হলে বা সম্প্রতি ক্যাথেটার পরানো হলেও PSA বাড়তে পারে। চিকিৎসক অন্য পরীক্ষার সাথে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়; কোনো ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করবেন না।


