এই লেখায় যা আছে
প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়াকে চিকিৎসার ভাষায় হেমাচুরিয়া (Hematuria) বলে। অনেকে ব্যথা না থাকায় বা একবার হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি অবহেলা করেন। কিন্তু প্রস্রাবে রক্ত সবসময়ই একটি লক্ষণ, যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
হেমাচুরিয়া কত ধরনের?
- খালি চোখে দেখা যায় এমন রক্ত: প্রস্রাব লাল, গোলাপি বা কোলার মতো বাদামি রঙের হয়, কখনো রক্তের চাকাও যায়।
- শুধু পরীক্ষায় ধরা পড়ে এমন রক্ত: প্রস্রাব দেখতে স্বাভাবিক, কিন্তু প্রস্রাবের মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষায় লোহিত রক্তকণিকা পাওয়া যায়।
প্রস্রাবে রক্ত যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ
- প্রস্রাবের রাস্তায় সংক্রমণ (UTI)।
- কিডনি বা মূত্রনালিতে পাথর।
- প্রোস্টেট বড় হওয়া।
- কিডনির প্রদাহজনিত রোগ (গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস)।
- আঘাত বা দুর্ঘটনা।
- মূত্রথলি, কিডনি বা প্রোস্টেটের টিউমার বা ক্যান্সার। ধূমপায়ী এবং চল্লিশোর্ধ্বদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।
- রক্ত পাতলা করার ওষুধ। তবে এসব ওষুধ খেলেও প্রস্রাবে রক্ত গেলে অন্য কারণ আছে কিনা পরীক্ষা করতে হয়।
লাল প্রস্রাব মানেই কি রক্ত?
সবসময় নয়। বিটরুট বা কিছু খাবারের রং, কয়েকটি ওষুধ (যেমন যক্ষ্মার কিছু ওষুধ) প্রস্রাবের রং লাল বা কমলা করতে পারে। নারীদের মাসিকের রক্তও প্রস্রাবের নমুনায় মিশে যেতে পারে। তাই প্রস্রাব পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন
- খালি চোখে প্রস্রাবে রক্ত দেখলে, একবার হলেও।
- রক্তের চাকার কারণে প্রস্রাব আটকে গেলে। এটি জরুরি অবস্থা।
- রক্তের সাথে জ্বর, কাঁপুনি বা তীব্র ব্যথা থাকলে।
- ধূমপায়ী বা বয়স্ক ব্যক্তির ব্যথাহীন প্রস্রাবে রক্ত গেলে।
কী কী পরীক্ষা লাগতে পারে
- প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা ও কালচার।
- রক্তে ক্রিয়েটিনিন।
- কিডনি, মূত্রথলি ও প্রোস্টেটের আলট্রাসনোগ্রাম।
- প্রয়োজনে সিটি ইউরোগ্রাম।
- সিস্টোস্কোপি: প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে সরু ক্যামেরা ঢুকিয়ে মূত্রথলির ভেতর সরাসরি দেখা। মূত্রথলির টিউমার শনাক্তে এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা।
- প্রয়োজনে প্রস্রাবে ক্যান্সার কোষের পরীক্ষা (ইউরিন সাইটোলজি)।
চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের ওপর। সংক্রমণ হলে কালচার রিপোর্ট দেখে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। পাথর হলে পাথরের চিকিৎসা, প্রোস্টেট বড় হলে প্রোস্টেটের চিকিৎসা করা হয়। মূত্রথলির টিউমার ধরা পড়লে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে এন্ডোস্কোপিক অপারেশনে (TURBT) তা অপসারণ করা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে টিউমারের চিকিৎসার ফলাফল অনেক ভালো হয়।
আরও পড়ুন: কিডনিতে পাথর: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ এবং প্রোস্টেট বড় হওয়া (BPH)।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
একবার রক্ত গিয়ে বন্ধ হয়ে গেলে কি পরীক্ষা দরকার?
হ্যাঁ। রক্ত যাওয়া বন্ধ হলেও এর কারণ থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে মূত্রথলি বা কিডনির টিউমারে রক্ত মাঝে মাঝে যায় আবার বন্ধ হয়। তাই একবার হলেও ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
ব্যথা ছাড়া প্রস্রাবে রক্ত কি বেশি চিন্তার?
ব্যথাহীন প্রস্রাবে রক্ত মূত্রথলি বা কিডনির টিউমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে, বিশেষ করে ধূমপায়ী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে। দেরি না করে পরীক্ষা করান।
প্রস্রাবে রক্ত গেলে কি বেশি পানি খাওয়া উচিত?
পর্যাপ্ত পানি পান সাধারণত উপকারী। কিন্তু রক্তের চাকা যাচ্ছে বা প্রস্রাব আটকে যাচ্ছে মনে হলে পানি খেয়ে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যান।
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতার জন্য। এটি চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের বিকল্প নয়; কোনো ওষুধ নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করবেন না।


